“মানুষ হবো”- সফলতার মলাটে এক হাহাকার জীবনের গল্প

Loading...

“আর কেউ না জানুক- আমি জানি আব্বা, তুমি আমার মানুষ করতে যায়া একটু একটু করে নিজেরে শেষ করে দিছো আব্বা। আজ আমার সব আছে আব্বা,আজ আমি মানুষের মতো মানুষ হয়ছি, দেখ সবকিছু ভালোই চলতাসে আব্বা, কিন্তু এই ভালোটা দেখার জন্যে তুমি নাই আব্বা,তুমি নাই…..! ”

উপরের লাইনগুলো অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে সদ্য “রঞ্জন ফিল্মেস” এর ব্যানারে ছাড়পত্র পাওয়া মাবরুর রশীদ বান্নাহ্’র “মানুষ হবো” টেলিফিকশন টির শেষ কথা। পিতাকে উদ্দেশ্য করে বলা এই কথা গুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে একজন মাদকাসক্ত সন্তানের সফল জীবনের মলাটে হাহাকারের গল্প।

মৃত পিতার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে টাই-স্যুট-কোট পড়া একটা ছেলে ঝুম বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে অতীত রোমান্থান করতে করতে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে, কেমন হতে পারে দৃশ্যটা!

” মানুষ হবো” নাটকটি দেখতে গিয়ে এমন দৃশ্যের সামনে বারবার পড়তে হবে আপনাকে।সহজ করে বললে দৃশ্য ই আপনার মগজকে টেনে নিয়ে নিয়ে যাবে বারংবার।

ঈদ এলেই টিভি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুলো লেগে যায় নাটক সহ হরেক রকম বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠান বানানোর হিড়িক।সময় যত ঘনিয়ে আসে নাট্য নির্মাতা,অভিনেতা ও অভিনেত্রী সহ টিভি পাড়ার কলাকুশলীরা ততই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কখনো কখনো তাদের দম ফেলার জো.. ই থাকে না।রাতদিন এক করে কাজ করতে হয়।এসব কেন?এই প্রশ্নের একটা ই উত্তর “দর্শকের জন্যে”! দর্শক ও তাদের এই হাড়ভাঙা পরিশ্রম গ্রহন করছেন বেশ হাসিমুখে ই। দর্শক, কুশলীব আর নাট্য কারিগরদের এক কাতারে বসিয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক আর অনলাইন ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব।এর বদৌলতে দর্শক সমাজ এখন পেয়েছে সাদা কে “সাদা” আর কালো কে “কালো” বলার স্বাধীনতা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের এই ঝাল-মিষ্টি প্রতিক্রিয়ায় সহজে ভাগ বসাতে পারছেন নাট্য নির্মাতা আর অভিনেতা আর অভিনেত্রীরা।তারা নিজেদের কাজের মূল্যায়ন করতে পারছেন এখন ঘরে বসেই।তবুও সবকিছু ছাপিয়ে দর্শকদের কিছু অভিযোগ,অনুযোগ আর আবদার কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

“এখনকার টিভি নাটক বিজ্ঞাপনে সয়লাব” দর্শকের এমন অভিযোগে কেউ কেউ আবার ঝুঁকছেন অনলাইন টিভি ফিকশন এর দিকে তাদের মধ্যে মাবরুর রশীদ বান্নাহ্ সফলতম একজন।জনপ্রিয় এই নির্মাতা ঈদে নির্মান করেছেন ১৩ টি ভিন্ন গল্প নিয়ে একদম ভিন্ন ধারার ১৩ টি ফিকশন। যার অধিকাংশ ই মুক্তি দেওয়া হয়েছে দর্শকদের কথা মাথায় রেখে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গুলোতে ।দর্শক সমাজ যাতে নির্বিঘ্নে উপভোগ করতে পারেন তাই এই ব্যবস্থা! সদ্য মুক্তি পেয়েছে “মানুষ হবো”।

“মানুষ হবো” ঘুনেধরা এক সমাজের রূঢ় গল্প। মাদকের কবলে ধুঁকে ধুঁকে মরা হাজারো তরুনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠেছে গল্পের সজল নামক চরিত্রটির উপর।শহর, মফস্বল, আর গ্রাম কেউ রেহাই পায় নি মাদকের কালো ছায়া থেকে। ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেওয়া এই মাদক ঠিক কতোটা বিষিয়ে তুলতে পারে একটা মানুষের জীবনকে তাই সাজিয়ে গুছিয়ে পর্দায় তুলে এনেছেন নির্মাতা।

শত শত বানোয়াট আর মিথ্যা গল্পের ভীড়ে “মানুষ হবো” আমাদের খুব পরিচিত চেনা সত্য আর বাস্তব গল্প।গ্রাম্য সমাজে এই গল্পের প্রথম ভাগ দেখেই আমরা মূলত বেড়ে উঠেছি।গ্রাম্য মেধাবী ছেলেরা গ্রামের পড়ালেখা পাঠ চুকিয়ে শহরে পাড়ি দেয়।কৃষক পিতা সর্বস্ব বাজি রেখে প্রিয় সন্তানকে পাঠান মানুষ হবার মিছিলে। এই মিছিলে থেকে কেউ ফিরে আসে আবার কেউ কেউ ফেরে না।আমাদের পরিচিত শৈশবের ছবিটির ও মতো ই গল্পের কৃষক পরিবারের সজল ও পাড়ি দেয় শহরে এক নতুন জীবনের খোঁজে।যার ফেরার দিকে এক দরিদ্র পিতা, বড় বোন আর মা যার প্রতীক্ষায় বুভুক্ষুর মতো চেয়ে আছে। সন্তানের ফেরা না ফেরার উপর নির্ভর করবে তাদের জীবন।

মেসের নিদারুণ কষ্ট,সিনিয়রদের অকথ্য অত্যাচার,নানা শহুরে মানুষের চোখ রাঙানিতে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেও পারে নি মায়াকাড়া দুটো চোখের শাসন থেকে নিজেকে দূরে রাখতে।সরল বিশ্বাসে মেয়েটির কথায় হাতের মুঠোয় পুরে নেয় ইয়াবা,ফেন্সি,সহ ভয়ানক এক নেশার জগতকে। নেশার দুনিয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে পিষে মেরে ফেলে বাবার স্বপ্ন, বোনের বিসর্জন আর মায়ের চোখের নোনা জল।

দরিদ্র পিতার কষ্ট পাঠানো সেমিস্টারের টাকা ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেওয়া ছেলেটার জীবনেও একদিন ঝড় আসে। জীবন ঝড়ে উলট পালট করে দেয় সব কিছু। লণ্ডভণ্ড এই দুর্যোগ লীলায় বাবা নামক বটগাছ টা হারিয়ে ফেলে নেশার জগতে বুদ হয়ে যাওয়া ছেলেটি। জীবনের অন্তিম লগ্নে হয়তো অনেকে ফেরে না। কিন্তু গল্পের সজল ফেরেছে। রঙ চকচকে মিথ্যা মাদকের নেশার জগত থেকে সজল ফিরে দেখিয়েছে মানুষ চাইলেই পারে।সজলের ফেরা এবং অনেক বছর বাদে বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বলা কথা গুলো ই হলো সজলের এই গল্পের টুইস্ট বা সারকথা। কিংবা এক বাক্য বলা যায় এটিই “মানুষ হবো” এর মূলমন্ত্র।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে পুত্র, পিতার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে খোঁজে বেড়াচ্ছে একটি কুঁচকানো চামড়ার হাত। যে হাত ধরে এই পুত্রটি সফলতার পংখীরাজ ঘোড়ায় চড়ে পিতাকে দেখাতে চায় তার জয়ী পৃথিবী।

স্ক্রিনের ফাঁক দিয়ে বারবার কানে আসছে তাহসিন আহমেদ এর মায়া মাখানো গলায় চিরাচরিত সেই লাইন ” সফল হবো, মানুষ হবো…..”

নাটকটি দেখতে ক্লিক করুন :

Comments

Loading...